
প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার গতিটা সাম্প্রতিক সময়ে অত্যন্ত বেগবান হয়ে উঠেছে। কল্পনা আর বাস্তবের সীমারেখাটা এখন ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। এক সময় যা কেবল বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর গল্প ছিল, তার অনেক কিছুই এখন বাস্তব হয়ে ধরা দিচ্ছে আমাদের মাঝে। ঠিক এরকম আরেক বাস্তবতার সামনে আমাদের দাঁড় করিয়ে দিতে যাচ্ছেন মাইক্রোসফট এবং ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটন-এর একদল গবেষক।
একসময় মানুষের কল্পনা ছিল দূর থেকেই কোনো যন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করার। প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে মানুষের হাতে এক সময় চলে আসে ‘রিমোট কন্ট্রোল’ বা ‘দূরনিয়ন্ত্রণ’ প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে নানান ধরনের বৈদ্যুতিক যন্ত্রকে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু যদি ঈশারার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করার কথা বলা হয়, সে প্রযুক্তি এখন পর্যন্ত মানুষের নাগালের বাইরেই রয়ে গেছে। বিছানায় বসে থেকেই আঙ্গুলের ঈশারায় লাইট বা ফ্যানের মতো যন্ত্র চালু বা বন্ধ করা অথবা কম্পিউটারের কোনো অ্যাপ্লিকেশন চালু করা অথবা টিভি চালু করা এখনও পর্যন্ত আমাদের কল্পনার রাজ্য পেরিয়ে বাস্তবে প্রবেশ করতে পারেনি। তবে সে সময়ের বুঝি অবসান ঘটতে চলল।
গত কিছুদিন ধরেই মাইক্রোসফট তাদের গেম কনসোল এক্সবক্স-এর জন্য তৈরি করেছে এক বিশেষ ডিভাইস ‘কাইনেক্ট’। এর মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের নড়াচড়ার মাধ্যমে একটি গেমকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থা রয়েছে। অঙ্গসঞ্চালনের এই ব্যবহারকে এখন গেমের বাইরেও নানামুখী বৈদ্যুতিক যন্ত্রের মাঝে ছড়িয়ে দিতে একযোগে কাজ করছেন মাইক্রাসফট এবং ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটন এর গবেষক দল। তাদের আশাবাদ ভবিষ্যতে হয়তো লাইট-ফ্যান অন-অফ করা বা স্টেশন থেকে ট্রেনের টিকেট কেনা বা কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন নিয়ন্ত্রণেও এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা যাবে। আর এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে গবেষকরা মানবদেহকে ব্যবহার করতে যাচ্ছেন এই অ্যান্টেনা হিসেবে। এই প্রযুক্তিতে মানবদেহের সাথে সংযুক্ত থাকবে একটি ছোট্ট ডিভাইস যা মূলত কাজ করবে নানান ধরনের সিগন্যাল প্রসেসর হিসেবে। হাত, পা বা শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নড়াচড়ার প্রতিটি মুহূর্ত এটি সনাক্ত করতে সক্ষম হবে আর তার সাথে সেই নড়াচড়াগুলোর সংশ্লিষ্ট কমান্ডগুলোকে সেটি অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রে পাঠাতে সক্ষম হবে কমান্ড হিসেবে।
বিষয়টি নিয়ে মাইক্রোসফট-এর গবেষকদলের সিনিয়র গবেষক ডেসনি ট্যান বলেন, ‘এটি ব্যবহার করে আপনি সহজেই কোনো টিকেট বিক্রয় মেশিনের সামনে গিয়ে আপনার প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো ঈশারাতেই জানিয় দিতে পারবেন। অথবা গ্যাস স্টেশনে গিয়ে আপনার গাড়ির জন্য কতটুকু গ্যাস প্রয়োজন, তা মেশিন স্পর্শ না করেই জানাতে পারবেন।
গবেষক দলের ধারণা অনুযায়ী এই প্রযুক্তি ব্যবহারের খরচও হবে তুলনামূলকভাবে কম। গেম কনসোল নিনটেনডো উই বা কাইনেক্ট-এর মতো এই প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য বাড়তি কোনো যন্ত্র, যন্ত্রাংশ বা প্রযুক্তির প্রয়োজন নেই। বরং বাসাবাড়ির বৈদ্যুতিক সংযোগবাহী তার যে তড়িত্-চৌম্বকীয় বিকিরণ দিয়ে থাকে, সেই তড়িত্-চৌম্বকীয় বিকিরণ ব্যবহার করেই এই প্রযুক্তি কাজ করতে সক্ষম হবে। এরকম যে কোনো স্থানের বৈদ্যুতিক সংযোগ বা যন্ত্র থেকে স্বাভাবিক সে তড়িত্-চৌম্বকীয় বিকিরণ ঘটে থাকে, সেটাই এই প্রযুক্তি কার্যকর করার জন্য যথেষ্ট হবে বলেই তাদের ধারণা। এসব তড়িত্-চৌম্বকীয় বিকিরণের সাথে ক্রিয়া করবে মানবদেহের স্বাভাবিক বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র। আর এসব বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র বা তড়িত্-চৌম্বকীয় বিকিরণ সর্বদাই স্বাভাবিক মাত্রার মধ্যে অবস্থান করে বলে এগুলো থেকে মানবদেহের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনাও অনেক কম।
আসলে যে কোনো ধরনের বৈদ্যুতিক যন্ত্র বা বৈদ্যুতিক সংযোগের আশেপাশে মানবদেহের অবস্থান ব্যতিচার তৈরি করে থাকে। এটা নিয়ে অনেকদিন ধরেই অনেক বিজ্ঞানী এবং গবেষক কাজ করে যাচ্ছেন। মাইক্রোসফট এবং ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটনের এই গবেষক দলের একজন ড. সুইটেক এন প্যাটেল এই প্রযুক্তি নিয়েই কাজ করছেন দীর্ঘদিন থেকে। তার সাথ আরও কাজ করছেন ইউনিভার্সিটি অফ ডিউক-এর ইলেকট্রিক্যাল এন্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ম্যাট রেনল্ডস। ম্যাট রেনল্ড নতুন এই প্রযুক্তি সম্পর্কে বলেছেন, ‘মানবদেহের বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের ক্ষমতা সম্পর্কে আমরা ওয়াকিবহাল ছিলাম আগে থেকেই। নতুন এই প্রযুক্তির সার্থকতা হচ্ছে মানবদেহের সেইসব সিগন্যালকে কম্পিউটারের বোধগম্য সিগন্যাল হিসেবে রূপান্তরিত করতে পারা। আর এ কাজটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত সাফল্যের একটি কাজ।’ (সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক ১৭ অক্টোবর)
0 comments:
Post a Comment